বৃষ্টি আল্লাহর অপার দয়া
আবু হাম্মাদ শাহিদুল ইসলাম
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আমাদের রব আল্লাহ তাআলা বিশ্বপালনকর্তা, অসীম দয়ালু ও মহা অনুগ্রহকারী। তার অনুগ্রহ সৃষ্টিকুলকে ঘিরে রেখেছে। তিনি সৃষ্টি জগতের জন্য রিযিক নাযিল করেন। যাকে ইচ্ছা তাকে প্রদান করেন আবার যাকে ইচ্ছা বঞ্চিত করেন। সবকিছুর চাবিকাঠি তারই হাতে। সকল বড়ত্ব তারই জন্য মানায়।
তিনি যাদের ইচ্ছা বৃষ্টির মাধ্যমে সিক্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা বঞ্চিত করেন। তিনি রহস্যের ভাণ্ডার, খুবই ন্যায়বিচারক। তারই জন্য সমস্ত গুণগান। আল্লাহর কাছে না চাইলেও যা কিছু দিয়ে থাকেন তন্মধ্যে পানি অন্যতম।
বৃষ্টির পরিচয়: আকাশে উড়ন্ত মেঘমালা থেকে ঝরে পড়া পানির ফোঁটাকে বৃষ্টি বলা হয়। বৃষ্টি জীবনের জন্য অনিবার্য। অনাবৃষ্টি হলে পৃথিবীতে যে সকল প্রাণী বাস করে তার মৃত্যু হবে।
বৃষ্টি বর্ষিত হওয়া আল্লাহর অপার দয়া: নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে বৃষ্টি বর্ষিত হওয়া দয়ালু আল্লাহর একটি দয়া। কেননা এরই মাধ্যমে পশু-পাখি, তরু-লতা, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি, জিন-ইনসান ইত্যাদি সকল কিছুই জীবন্ত থাকে। বরং এটি হল জীবনের মূল চালিকাশক্তি। কেউ এর থেকে অমুখাপেক্ষী হতেই পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ
যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না যে, আসমানসমূহ ও জমিন মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, তারপর আমরা উভয়কে পৃথক করে দিলাম; এবং প্রাণবান সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? (সূরা আল আম্বিয়া: ৩০)
যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তারা কী জানে না যে, আকাশ ও জমিন এক সময় মিলিত ছিল। মাঝে কোনো ফাঁকা ছিল না। অতঃপর তিনি সেখান থেকে পানি বর্ষণ করতেন। আকাশ থেকে জমিনে বর্ষিত পানির মাধ্যমে নানা প্রকার উদ্ভিদ ও প্রাণী সৃষ্টি করেন। তারা কী এগুলো দেখে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করবে না এবং একক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে না? (তাফসীর থেকে সংক্ষেপিত)
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَرَأَيْتُمُ الْمَاءَ الَّذِي تَشْرَبُونَ. أَأَنْتُمْ أَنْزَلْتُمُوهُ مِنَ الْمُزْنِ أَمْ نَحْنُ الْمُنْزِلُونَ . لَوْ نَشَاءُ جَعَلْنَاهُ أُجَاجًا فَلَوْلَا تَشْكُرُونَ.
তোমরা যে পানি পান কর, সে সম্পর্কে তোমরা ভেবে দেখেছো কি? তোমরাই কি তা মেঘ হতে বর্ষণ কর, না আমি বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে ওটা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না কেন? (সূরা আল ওয়াকিয়া: ৬৮-৭০)
তিনি মেঘ থেকে বারি বর্ষণ করেন। সেখান থেকেই ভূপৃষ্ঠে প্রবাহিত নদী, সজোরে প্রবাহিত পুকুর সৃষ্টি করেছেন। তার থেকেই মিষ্ট পানি দান করেন। এটার মাধ্যমে আত্মা পরিতৃপ্ত হয়। (তাফসীরে সা'দী)
আল্লাহ তাআলা বৃষ্টিকে পরিমিতভাবে বর্ষণ করেন। যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দেন তাহলে জীবন্ত সবকিছু মারা যাবে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম আল জাওজিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আপনি আল্লাহর নিয়ামতের রহস্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন। তিনি পানি প্রয়োজন অনুসারে দিয়ে থাকেন যাতে জমিন তার প্রয়োজন মাফিক নিতে পারে। অতিবৃষ্টি হয়ে গেলে মাটির উপর যা আছে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। শস্য, ফল-ফলাদি ও শাকসবজিসহ অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। আবহাওয়া দূষিত হওয়ায় শরীরে নানা রকম রোগ দেখা দিবে। পানি বেশি হওয়ার কারণে রাস্তা-ঘাট ডুবে যাবে। অপরপক্ষে বৃষ্টি না হয়ে যদি প্রচুর খরা হয়। তাহলে শরীর উস্কোখুস্কো হয়ে যাবে এবং কূপ, ঝর্ণা, পুকুর ও নদী-নালা শুকিয়ে যাবে। পানির লেয়ার নিচে চলে যাবে। এ কারণে মারাত্মক ধরণের রোগ দেখা দিবে। তাই সূক্ষদর্শী আল্লাহর রহস্য হল উভয়ের মাঝামাঝি রাখা। এজন্যই বিশ্বের সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। (মিফতাহু দারিস সাআ'দাহ থেকে সংক্ষেপিত)
বৃষ্টি বর্ষণের গোপন রহস্য: এটা আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতের উজ্জ্বল প্রমাণ। আল্লাহ বলেন,
أَمَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ مَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُنْبِتُوا شَجَرَهَا أَإِلَهٌ مَعَ اللهِ بَلْ هُمْ قَوْمٌ يَعْدِلُونَ
অথবা তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং আকাশ হতে তোমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেন; অতঃপর তা দিয়ে মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করেন। ওর বৃক্ষাদি উদগত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে কি? তবুও ওরা এমন এক সম্প্রদায় যারা সত্য বিচ্যুত হয়। (সূরা আন নামল: ৬০)
জমিন পানির মাধ্যমে বেঁচে থাকে, পানির দ্বারা সিক্ত না হলে মারা যায় ও ফেটে চৌচির হয়ে যায়। চৈত্র মাসে যেমনটি পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَاللهُ أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَحْيَا بِهِ الأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِقَوْمٍ يَسْمَعُونَ
আল্লাহ আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। অতঃপর তার দ্বারা তিনি ভূমিকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন; অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা শ্রবণ করে। (সূরা আন নাহল: ৬৫)
যিনি পানির মাধ্যমে মৃত জমিনকে জীবিত করেন তিনি মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করতে অবশ্যই সক্ষম। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মহত্ব প্রস্ফুটিত হয়। আল্লাহ বলেন,
وَهُوَ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ حَتَّى إِذَا أَقَلَّتْ سَحَابًا ثِقَالًا سُقْنَاهُ لِبَلَدٍ مَيِّتٍ فَأَنْزَلْنَا بِهِ الْمَاءَ فَأَخْرَجْنَا بِهِ مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ كَذَلِكَ نُخْرِجُ الْمَوْتَى لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
তিনিই স্বীয় করুণার (বৃষ্টির) প্রাক্কালে বাতাসকে সুসংবাদবাহীরূপে প্রেরণ করেন। শেষ পর্যন্ত উক্ত বাতাস যখন (পানি-ভরা) ভারী মেঘমালা বহন করে আনে, তখন কোন নির্জীব ভূখন্ডের দিকে আমি তা প্রেরণ করি, অতঃপর তা থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি। তারপর তা দিয়ে সর্ববিধ ফলমূল উৎপাদন করি। এভাবেই আমি মৃতকে জীবিত করে থাকি। যাতে তোমরা শিক্ষালাভ করতে পার। (সূরা আল আরাফ: ৫৭)
সমস্ত মানুষ পানিকে গুদামজাত করে রাখতে অক্ষম। আল্লাহ বলেন,
وَأَرْسَلْنَا الرِّيَاحَ لَوَاقِحَ فَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَسْقَيْنَاكُمُوهُ وَمَا أَنْتُمْ لَهُ بِخَازِنِينَ
আমি বৃষ্টিগর্ভ বায়ু প্রেরণ করি অতঃপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদেরকে পান করাই এবং ওর ভান্ডার তোমাদের কাছে নেই। (সূরা আল হিজর: ২২)
ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা তা সংরক্ষণ করতে পারবে না। বরং আমিই তোমাদের কাছে পানি বর্ষণ করি ও সংরক্ষণ করি। আমি বিশুদ্ধ পানি দেই ও জমিনে সবকিছু উৎপন্ন করি। যদি তিনি চাইতেন তাহলে দূর করে দিতেন। কিন্তু তিনি নিজ অনুগ্রহে মিষ্টি পানি অবতীর্ণ করেছেন এবং ঝর্ণা, কূপ ও নদী-নালা ইত্যাদির মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন। যা দীর্ঘদিন তারা নিজেরা পান করবে, পশুকে পান করাবে ও ক্ষেত-খামারে সেঁচ দিবে। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
মিষ্টি পানি অবতীর্ণ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযক, বরকত, অন্তর ও শরীরের জন্য পবিত্রকারী। বরং সমস্ত সৃষ্টির জন্য মস্ত বড় খুশির সংবাদ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَنَزَّلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً مُبَارَكًا فَأَنْبَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْحَصِيدِ
আকাশ হতে আমি বর্ষণ করি কল্যাণকর বৃষ্টি এবং তার দ্বারা আমি সৃষ্টি করি বহু বাগান ও পরিপক্ব শস্যরাজি। (সূরা ক্বাফ: ৯) আল্লাহ আরো বলেন,
اللَّهُ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيَاحَ فَتُثِيرُ سَحَابًا فَيَبْسُطُهُ فِي السَّمَاءِ كَيْفَ يَشَاءُ وَيَجْعَلُهُ كِسَفًا فَتَرَى الْوَدْقَ يَخْرُجُ مِنْ خِلَالِهِ فَإِذَا أَصَابَ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ إِذَا هُمْ يَسْتَبْشِرُونَ
আল্লাহ, যিনি বায়ু পাঠান, ফলে তা মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে; অতঃপর তিনি এটাকে যেমন ইচ্ছে আকাশে ছড়িয়ে দেন; পরে এটাকে খণ্ড-বিখণ্ড করেন, ফলে আপনি দেখতে পান সেটার মধ্য থেকে নির্গত হয় বৃষ্টিধারা; তারপর যখন তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের কাছে ইচ্ছে এটা পৌঁছে দেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। (সূরা আর রুম: ৪৮)
পানির লেয়ার যদি নিচে চলে যায় তাতেও তারা পানি তুলতে সক্ষম হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ أَصْبَحَ مَاؤُكُمْ غَوْرًا فَمَن يَأْتِيكُم بِمَاءٍ مَّعِينٍ
বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি? যদি পানি ভূগর্ভে তোমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে কে তোমাদেরকে প্রবহমান পানি এনে দেবে? (সূরা আল মুলক: ৩০)
غَوْرٌ শব্দের অর্থ হল শুকিয়ে যাওয়া অথবা পানি এত গভীরে চলে যাওয়া যে, সেখান হতে তা বের করা অসম্ভব হয়। অর্থাৎ- আল্লাহ তাআলা যদি পানি শুকিয়ে দিয়ে তার অস্তিত্বই শেষ করে দেন অথবা মাটির এত গভীরে করে দেন, যেখান থেকে পানি বের করতে সর্বপ্রকার যন্ত্র ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়, তাহলে বল, কে আছে এমন, যে তোমাদের জন্য প্রবাহমান ও নির্মল পানির ব্যবস্থা করে দেবে? অর্থাৎ- কেউ নেই। এটা মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ যে, তোমাদের অবাধ্যতা সত্ত্বেও তিনি তোমাদেরকে পানি থেকে বঞ্চিত করেননি। (তাফসীর আহসানুল বায়ান)
বৃষ্টি বর্ষণ না হলে করণীয়: দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দুআ করা ও সকল আলিমের ঐকমত্যে সলাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার সলাত আদায় করা সুন্নাহ। হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَبَّادَ بْنَ تَمِيمٍ، عَنْ عَمِّهِ، قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِلَى الْمُصَلَّى يَسْتَسْقِي، وَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ، وَقَلَبَ رِدَاءَهُ. قَالَ سُفْيَانُ فَأَخْبَرَنِي الْمَسْعُودِيُّ عَنْ أَبِي بَكْرٍ قَالَ جَعَلَ الْيَمِينَ عَلَى الشِّمَالِ.
‘আব্বাদ ইব্নু তামীম (রহ) তাঁর চাচা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইসতিসকার জন্য ঈদগাহের ময়দানে গমন করেন। তিনি কিবলামুখী হলেন, অতঃপর দু’রাক’আত সালাত আদায় করলেন এবং তাঁর চাদর উল্টিয়ে নিলেন। সুফিয়ান (রহ) বলেন, আবূ বকর (রা) হতে মাসঊদ (রা) আমাদের বলেছেন, তিনি (চাদর পাল্টানোর ব্যাপারে) বলেন, ডান পাশ বাঁ পাশে দিলেন। (সহীহুল বুখারী: ১০২৭)
বৃষ্টির সময় আমাদের প্রতিক্রিয়া যা হওয়া উচিত: বৃষ্টি বর্ষণের সময়; বিশেষ করে প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত বাতাসের সময় এ ভয় করা যে, হয়ত এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ : وَكَانَ إِذَا رَأَى غَيْمًا، أَوْ رِيحًا عُرِفَ فِي وَجْهِهِ. قَالَتْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الْغَيْمَ فَرِحُوا رَجَاءَ أَنْ يَكُونَ فِيهِ الْمَطَرُ، وَأَرَاكَ إِذَا رَأَيْتَهُ عُرِفَ فِي وَجْهِكَ الْكَرَاهِيَةُ ؟ فَقَالَ : " يَا عَائِشَةُ، مَا يُؤْمِنِّي أَنْ يَكُونَ فِيهِ عَذَابٌ ؟ عُذِّبَ قَوْمٌ بِالرِّيحِ، وَقَدْ رَأَى قَوْمٌ الْعَذَابَ، فَقَالُوا : {هَذَا عَارِضٌ مُمْطِرُنَا}
আয়িশা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
যখনই তিনি মেঘ অথবা ঝড়ো হাওয়া দেখতেন
তখনই তাঁর চেহারায় তা পরিলক্ষিত হত। তিনি বললেন, মানুষ যখন মেঘ দেখে তখন বৃষ্টির আশায় আনন্দিত হয়। কিন্তু আপনি যখন মেঘ দেখেন, তখন আমি আপনার চেহারায় আতংকের ছাপ পাই। তিনি বললেন, হে আয়িশা! এতে আযাব না থাকার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। বাতাস দিয়েই তো এক কওমকে আযাব দেয়া হয়েছে। সে কওম আযাব দেখে বলেছিল, এ তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দিবে।
(সহীহুল বুখারী: ৪৮২৯)
যে ব্যক্তি তারকার মাধ্যমে বৃষ্টি হয় এমন বিশ্বাস করে সে কাফের: একথা স্বীকৃত যে, বৃষ্টি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের সকলের প্রতি রহমত স্বরুপ। আর এটাই বিশুদ্ধ তাওহীদের নিদর্শন। কেউ তারকা বা অন্য কিছুর মাধ্যমে বৃষ্টি হওয়াকে বিশ্বাস করলে সে কাফের হয়ে যাবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ -رضي الله عنه- قال: صَلَّى لَنَا رَسولُ اللَّهِ -صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ- صَلَاةَ الصُّبْحِ بالحُدَيْبِيَةِ علَى إثْرِ سَمَاءٍ كَانَتْ مِنَ اللَّيْلَةِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ أقْبَلَ علَى النَّاسِ، فَقالَ: (هلْ تَدْرُونَ مَاذَا قالَ رَبُّكُمْ؟) قالوا: اللَّهُ ورَسولُهُ أعْلَمُ، قالَ: (أصْبَحَ مِن عِبَادِي مُؤْمِنٌ بي وكَافِرٌ، فأمَّا مَن قالَ: مُطِرْنَا بفَضْلِ اللَّهِ ورَحْمَتِهِ، فَذلكَ مُؤْمِنٌ بي وكَافِرٌ بالكَوْكَبِ، وأَمَّا مَن قالَ: بنَوْءِ كَذَا وكَذَا، فَذلكَ كَافِرٌ بي ومُؤْمِنٌ بالكَوْكَبِ
যাইদ ইবনু খালিদ জুহানী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলই বেশি জানেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি মু’মিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, আল্লাহ্র করুনা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে। (সহীহুল বুখারী: ৮৪৬)
বৃষ্টির সময় দুআ করলে কবুল হয়: দুআ কবুলের অন্যতম মুহূর্ত হল বৃষ্টির সময়। এ সময়ে দুআ করলে আল্লাহ তার দুআ ফেরত দেন না।
عن سهل بن سعد الساعدي -رضي الله عنه- قال: قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم-: (ثِنتانِ ما تُرَدّانِ : الدُّعاءُ عِنْدَ النِّداءِ، وَتَحْتَ المَطَرِ) رواه الحاكم وحسنه الألباني.
সাহল বিন সাদ আস-সাঈদী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুটি দুআ ফেরত দেওয়া হয় না। আযানের সময় দুআ ও বৃষ্টির নিচে দুআ। (ইমাম বায়হাক্বী (রহ.) বর্ণনা করেছেন ও আলবানী (রহ.) হাসান বলেছেন।)
ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহ আল-উম্ম কিতাবে বলেন, আমি একাধিক ব্যক্তি থেকে মুখস্ত করেছি যে, সলাত কায়েমের সময় ও বৃষ্টি বর্ষণের সময় আবেদনের ডাকে সাড়া দেওয়া হয়।
বৃষ্টির সময় পঠিতব্য দুআ: বৃষ্টি বর্ষণের সময় বিশেষ কিছু দুআ রয়েছে।
১. আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনার দুআ:
اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُغِيثًا مَرِيئًا مَرِيعًا نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ عَاجِلًا غَيْرَ آجِلٍ
হে আল্লাহ! আমাদেরকে বিলম্বে নয় বরং তাড়াতাড়ি ক্ষতিমুক্ত-কল্যাণময়, তৃপ্তিদায়ক, সজীবতা দানকারী, মুষল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করো।
(আবূ দাউদ: ১১৬৯)
২. اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি মুষলধারে উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করো।
৩. প্রচণ্ড বেগে বাতাস প্রবাহিত হলে এই দুআ পড়তে হয়:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا، وَخَيْرَ مَا فِيهَا، وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا، وَشَرِّ مَا فِيهَا، وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে মেঘের কল্যাণ কামনা করছি ও এর মধ্যে যে কল্যাণ নিহিত আছে এবং যে কল্যাণের সাথে প্রেরিত হয়েছে তাও এবং তোমার কাছে এর অকল্যাণ ও এর মধ্যে যে অকল্যাণ নিহিত আছে এবং যে অকল্যাণ নিয়ে এসেছে তা থেকে আশ্রয় চাই। (সহীহ মুসলিম: ৮৯৯)
৪. মেঘের গর্জন শুনে নিম্নের দুআটি পড়তে হয়: سُبْحَانَ الَّذِي يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ
তিনি পবিত্রময় মেঘের গর্জন যার প্রশংসায় ও ফেরেস্তারা ভয়ে তাসবীহ পাঠ করে। (মুয়াত্তা মালেক: ২৮৩৯)
৫. اللهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমাদের পার্শ্ববর্তীদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করো, আমাদের উপর নয়।
যখন অতিবৃষ্টি শুরু হবে, অকল্যাণের ভয় হবে তখন উপরোক্ত দুআটি পাঠ করা সুন্নাহ।
৬. বৃষ্টি শেষে এই দুআ পড়তে হয়:
مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ
আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় বৃষ্টি বর্ষিত হল। (সহীহুল বুখারী: ৮৪৬)
বছরের প্রথম বৃষ্টি গায়ে মাখা: বিদ্বানগণের মতে, একজন ব্যক্তির জন্য প্রথম বৃষ্টিতে তার শরীরের কিছু অংশকে ভেজানো মুস্তাহাব। হাদীসে এসেছে,
عن أنس -رضي الله عنه- قال: أَصَابَنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللهِ -صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- مَطَرٌ، قَالَ: فَحَسَرَ رَسُولُ اللهِ -صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- ثَوْبَهُ، حَتَّى أَصَابَهُ مِنَ الْمَطَرِ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ لِمَ صَنَعْتَ هَذَا؟ قَالَ: (لِأَنَّهُ حَدِيثُ عَهْدٍ بِرَبِّهِ -تَعَالَى-)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলাম এমন সময় বৃষ্টি নামল। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কাপড় খুলে দিলেন। ফলে এতে বৃষ্টির পানি পৌঁছল। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এরূপ কেন করলেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কেননা এটা মহান আল্লাহর নিকট থেকে আসার সময় খুবই অল্প। (সহীহ মুসলিম: ৮৯৮)
কথায় আছে, “পানির অপর নাম জীবন।” পানি ছাড়া জীবন অকল্পনীয়। তাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা আমাদের উপর অত্যাবশ্যক। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদেরকে উপকারী বৃষ্টি দেন যেটা জমিন, অন্তর ও শরীরকে জীবিত রাখে। আমাদের দেশ ও মুসলিম দেশগুলোকে উজ্জীবিত করেন। আমীন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

